Home / কীর্তিগাঁথা / ইতিহাসের মহানায়ক – আতাউল হাকিম আরিফ

ইতিহাসের মহানায়ক – আতাউল হাকিম আরিফ

ইতিহাসে মহানায়ক অনেকেই আছেন লেলিন, স্টালিন, মহাত্মাগান্ধী, সানইয়াত সেন, ফিদেল কাস্ত্রো, নেহেরু এমন অনেক নেতার নাম-ই আমরা পড়েছি,জেনেছি। আমরা জানি ইতিহাস মানেই অতীত, এই অতীতের মহানায়কগণকে আমরা স্মরণ করে আবেগ তাড়িত হই-জীবনী পাঠে মুগ্ধ হই কিন্তু একজন শেখ মুজিব শুধু মুগ্ধতায় নয় চেতনার অধীস্বর। শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় যেমন নুয়ে পড়ি তেমনি বুকে ধারণ করে এগিয়ে যায় স্বদেশ গড়ার প্রত্যয়ে-তিনি যেনো এক মন্ত্রবান! সত্যিই তিনি আমাদের মহানায়ক ইতিহাসের অপার বিস্ময়। আমি শেখ মুজিবকে দেখেনি তবে শৈশব থেকেই পারিবারিক আবহে শেখ মুজিবকে অস্তিত্বে ধারণ করেছি। বাবা, দাদা, বড়ভাই সবার কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের গল্প শুনে শুনে বাড়ির দেয়ালে ঝুলানো এই মহানায়কের ছবিতে বুঁদ হয়ে থাকতাম। 


আমাদের বেড়ে উঠাকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো স্বৈরাচারের কাছে পদানত হলেও  পরিবারের সবাই ছিল মুজিববাদী তাছাড়া আমাদের পরিবারে রাজনীতির চর্চাটাও বেশ হতো, তাই একেবারেই ছোটবেলা থেকেই বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধ শব্দগুলো অস্তিত্বে বিঁধে গিয়েছিল। পরিবার থেকেই মুক্তিযুদ্ধকালীন শ্লোগানগুলো শুনতাম ”তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।ভোটের মুখে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। জীবনের বেড়ে উঠা গল্পের সাথে একজন শেখ মুজিবকে জড়িয়ে নিতাম চিন্তা ও মননে। তাঁর আদর্শেই উদ্বেলিত হয়ে স্কুল জীবন থেকেই জড়িয়ে পড়ি তাঁরই হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে।” চেতনা ও রাজনৈতিক অধ্যায়ে শেখ মুজিবর রহমানকে পাঠ করতাম আর বিস্মিত হয়ে ভাবতাম আমাদেরও একজন শেখ মুজিব আছে, আবার বুকের ভেতর বোবা কান্নাও  পেতো কেননা আমরা সেই কুলাঙ্গার জাতি যারা কিনা আমাদের-ই মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করেছি। এ বড়-ই লজ্জার! এই বড়-ই কলঙ্কের! এই কলঙ্কের তিলক আমরাই পড়িয়েছি স্বদেশের বুকে! অথচ একজন শেখ মুজিব ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার পূর্বাহ্নে বলেছিলেন ”বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা” খুনীচক্র একজন শেখ মুজিবর রহমানকে খুন করেছে কিন্তু শেখ মুজিব ইতিহাসের সন্তান। ইতিহাস স্ব-মহিমায় ধারণ করেছে তাঁকে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসির জরিপেও উঠে এসেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। ড. এনামুল হক তার গবেষণায় দেখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু বিগত দু-হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। অতীশ দীপঙ্কর, শ্রীজ্ঞান চৈতন্যদেব থেকে শুরু করে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল সবাইকে ছাড়িয়ে ক্রমেই যিনি বিশেষ প্রতিভা-প্রেক্ষাপটে মহোত্তম, যিনি সমগ্র বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। এমন মহোত্তম ইতিহাস-ই যে তাঁকে সে স্বীকৃতির বরমাল্য পড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অসামান্য রাজনৈতিক সাফল্য, দূরদৃষ্টি এবং চিন্তার বিশালতা তাঁকে বিশ্বের অনেক মহান রাজনীতিবিদ থেকে আলাদা পরিসরে বসিয়েছে। কবি জসিম উদ্দীনের ভাষায় ”মুজিবুর রহমান ওই নাম যেনো ভিসুভিয়াসের অগ্নি উগারী বান” সত্যিই তো তিনি অগ্নি উগারী বান তাঁর অগ্নিঝড়া বক্তব্য এবং অসীম সাহসী নেতৃত্বে পুরো বাঙালি জাতি যেমন একত্রিত হয়েছে তেমনি পদানত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম সামরিক সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনী। তিনিই সর্বপ্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিন্তা উপলব্ধি করেছিলেন, তিনি জানতেন এই জাতীয়তাবাদ না থাকলে আমাদের স্বাধীনতা কোনোদিন-ই অর্জিত হবেনা-তাই তিনি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন করে স্বাধীনতার মন্ত্র ঢেলে দিয়েছিলেন। একজন শেখ মুজিবর রহমান এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের উত্থান স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করা সম্ভব নয়-ইতিহাসের বিশাল কলরবে সেটি বিস্তৃত। সামান্যতম আঁচড় দেবো সেটিও অনেক বেশি জটিল ও দুর্বোধ্য। শুধুমাত্র কিছুটা আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যায় বলা চলে। মূলত বঙ্গবন্ধু একটি সময়ের মহানায়ক মধ্যষাটে শুরু মধ্য সত্তুরে এর সমাপ্তি কিন্তু ইতিহাসে অমর অক্ষয়। পাকিস্তান সময়কালে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার বাংলা ভাষাভাষী জাতি গোষ্ঠীর সাথে একাত্ব হয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁদের আবেগ অনুভূতি সর্বোপরি অধিকার আদায়ে বৈপ্লবিক চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বঙ্গবন্ধুর পূর্বাহ্নে অগ্রজ রাজনীতিবিদ ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খাঁন ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, আবুল হাসেম, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ। তাঁদের সাথে যুক্ত হয়ে শেখ মুজিবর রহমান অবিভক্ত বাংলাদেশের মুসলিম রাজনীতিতে যেমন যুক্ত ছিলেন তদ্রুপ সেক্যুলার রাজনীতির ধারণারও প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনিই। শেখ মুজিবর রহমানের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিলো তিনি অতি সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষকে একসূত্রে গেঁথে নিয়েছিলেন। তাঁদের মাঝেও ছিলো বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম দরদ ও ভালবাসা। মূলত তাঁদেরকে সাথে নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু পূর্ণ সফলতা লাভ করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ব্যবস্থা শঠতা ও হটকারিতা বঙ্গবন্ধুকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে সেখান থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন এদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি অনিবার্য। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের  উত্থানের শুরুতেই ভাষা আন্দোলন ও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সফলতা তাঁকে অনেক বেশীই উজ্জীবিত করেছে। জেল জুলুম হুলিয়া ভোগ করেও সেই উপলব্ধির পাশাপাশি দূরদর্শিতা ও অসীম সাহসের তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যান। তার রাজনীতির অন্যতম গুরত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট ছয়দফা দাবি আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা। মূলত ছয়দফা দাবী ছিলো তার দূরবর্তী লক্ষ্যে অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা। খুব দৃঢ়ভাবে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর লক্ষ্যের দিকে-বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মাঝে খুব তাড়াতাড়ি সঞ্চারিত করেছিলেন অধিকার আদায় ও মুক্তির দাবি। বারবার জেলে পুরেও পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবকে ক্ষান্ত করতে পারেনি-ততদিনে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন, ছাত্রদের ১১ দফা দাবীর মধ্য ৬৯’র গণ অভ্যুত্থান, ৭০’র নির্বাচনের সফলতার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু তথা বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ চূড়ান্ত সফলতার দিকে হাঁটছিলেন-৭০’র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা না দেওয়ার চক্রান্ত এবং ৭ মার্চের ভাষণ এবং মুক্তিযুদ্ধ পুরো অধ্যায়ে একজন শেখ মুজিব স্পুলিঙ্গের মতো জ্বলেছিলেন বাঙালির চূড়ান্ত মুক্তির চেতনায়। ৭ই মার্চের ভাষণ ছিলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অলিখিত ভাষণ। এটি ছিল এক অমর বানী-বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবিতার পংক্তি, কেননা ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক সে ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বর্জ্রকণ্ঠ এবং স্বাধীনতার ঘোষণা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করলো প্রতিটি বাঙালির হৃদয়, সে মন্ত্রেই ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধে। যেটি পরবর্তীতে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে  সংরক্ষণ করছে। শেখ মুজিব খুব ভালোভাবেই জানতেন এদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁকে হয়তো জীবনও দিতে হতে পারে-দেশদ্রোহিতার মামলায় তাঁকে যেকোনো দিন মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হইতে হতে পারে- তিনি যে সত্যিকার অর্থেই নেতা-

এদেশের মানুষকে ভালবেসে জীবন উৎসর্গ মন্ত্রেই তিনি এসেছিলেন ধরণীতে। নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করেই তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার পথ দেখিয়েছেন, বিশ্ব দরবারে বাঙালিকে আত্মপরিচয়ের ঝাণ্ডা তুলে দিয়েছিলেন- স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে। একজন শেখ মুজিবর রহমানের জন্ম হয়েছিল বলেই পৃথিবীর বুকে একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ধাপে ধাপে সংগ্রামের পথ ধরে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এদেশের স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছে-বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দৃঢ়তায়, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে ভালবেসে বাঙালি তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলো। এইকথাও স্বীকৃত যে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ভূখণ্ডকে বঙ্গবন্ধু পূর্বেই বাংলাদেশ নামে ঘোষণা দিয়েছিল। কেননা এই বাংলাদেশ-ই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের মধ্যেই প্রোথিত ছিলো। একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের পরিচয় থেকে ধর্ম নিরেপক্ষ জাতিসত্ত্বার পরিচয় প্রদানে বঙ্গবন্ধু তার অপার মহিমায় তরান্বিত করেছিলেন। তাতেই বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দৃঢ়চেতায় এবং উন্নত মূল্যবোধ লালনের মধ্য দিয়ে।বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন শব্দে রূপলাভ করেছে। তাইতো বাঙালির শ্লোগান হয়ে উঠেছে “তোমার দেশ আমার দেশ বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”।দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন অনেক প্রতিবন্ধকতা আসবেই, স্বাধীনতা বিরোধীদের ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিয়ে সামনের দিকে চলছিলেন, সেই লক্ষ্যে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পাশাপাশি শোষিতের গণতন্ত্রের ধারণার উপর এগোচ্ছিলেন পাশাপাশি শোষণ মুক্তির লক্ষে সমাজতন্ত্রের ধারণার সমর্থন আদায় এবং বাঙালির আজন্ম লালিত ধর্ম নিরপেক্ষতার বিকাশেও তিনি কাজ করছিলেন যা পূর্বে কেউ করেনি। আমাদের দূর্ভার্গ্য যে সেই সময়টুকু আমরা তাঁকে দিইনি, যখনি তিনি তাঁর সার্বিক ধ্যান ধারণা ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়তে দুর্নিবার এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখনি ১৯৭৫, ১৫ই আগষ্ট ইতিহাসের সবচাইতে নির্মম অধ্যায়টি রচিত হলো। স্ব-পরিবারে হত্যা করা হলো পিতা মুজিবকে এবং এর মধ্যে দিয়ে প্রমাণিত হলো স্বাধীনতা বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী দেশের ভেতরে ও বাইরে সক্রিয় ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্রের জন্মদাতাকে নয়, একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংসের অপচেষ্টা চালিয়েছে তারা।অনেকাংশেই সফল বলা চলে।

পুরোপুরি নয়, অনেকাংশে বলার অর্থ প্রায় তিন দশক পরে হলেও বাঙালি জাতিকে পুনরায় একটি শক্ত ভিতের  উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তারই কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। নিশ্চিতভাবে বলা যায় ১৯৭৫-১৫ আগষ্ট সংগঠিত হয়েছে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে-এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যেমন দায়ী তেমনি অস্বীকার করার উপায় নেই এর সহযোগী একটি অংশ ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার পাক্কালে এদের মধ্যে র‍্যাডিক্যাল চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটে, মূলত কোন ধরণের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিলো তা অনুধাবণে ব্যার্থ হয়ে পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে এই অংশটি প্ররোচিত হয়েছিল! বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলে শ্রেণি সংগ্রামের নামে তারা তৎকালীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বচিত সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে ব্যাংক ডাকাতি, টাকা লুট,রেললাইন উপড়ে ফেলে-এমনকি সেইসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতেও সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো, হত্যা করেছিল হাজার হাজার আওয়ামীলীগ সমর্থিত নেতা কর্মিদের। তারা বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করে স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে। সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মধ্য দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলার। সামরিক বাহিনীর একটি অংশ তাঁদের অনুসারী হওয়ায় খুব সহজেই হত্যাকাণ্ড তরান্বিত করতে সক্ষম হয়।শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই খুনিচক্র ক্ষান্ত হননি তারা বিচারের পথ রুদ্ধ করতে জারি করে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯৭৫ সালে জারিকৃত মৌলিক মানবাধিকার বিরোধী এই  অধ্যাদেশটি সংবিধানের ৯২(২) অনুচ্ছেদের মর্ম মোতাবেক সংসদে অনুমোদন না নেওয়ায় এর স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে মরহুম জেনারেল জিয়াউর রহমানের অবৈধ শাসনকালে ২৩ এপ্রিল,১৯৭৭ খ্রীঃ সামরিক সামরিক ফরমান বলে এই মৃত অধ্যাদেশটিকে সচল করে, এরপর ৬ই এপ্রিল ১৯৭৯ খ্রীঃ পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে কুখ্যাত বেআইনি অধ্যাদেশটি চতুর্থ তপশিলে ৩ ক এবং ১৮ অনিচ্ছেদে সংযোজন করে জাতীয় সংবিধানকে কলঙ্কিত করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে একই বৎসর ১২ নভেম্বর ৭ম জাতীয় সংসদে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিত করে সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের পথ তরান্বিত করেন। ১৯৭৫, ১৫ আগষ্ট ট্রাজেডির পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বিকৃত করে সমস্ত মূল্যবোধকে পদদলিত করে উল্টোমুখী যাত্রায় ধাবিত করেছিলো পাকিস্তানের দোসর শাসকগোষ্ঠী। রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ পদে আসীন হয়েছিলো রাজাকার, আলশামস,আল বদর গোষ্ঠী ও তাঁদের প্রেতাত্মাগণ। একদিকে শ্রেণী বৈষম্যের বিকাশ ঘটিয়ে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়েছে অন্যদিকে সংবিধান থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে সেক্যুলার রাজনৈতিক দর্শন। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী মুখে জোট নিরেপক্ষতার কথা বললেও প্রতিক্রিয়াশীল আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে মেলবন্ধন দৃঢ় করেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক শাসনকালে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সম্পদের মাত্র ১৫ % এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে। দরিদ্রতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাঠামো অনেকটা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছিল ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করার পাশাপাশি আইনের শাসন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত করেছে, কিন্তু ২০০১ সালে জামায়াত বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসে দেশকে আবারও হেলে গভীর ষড়যন্ত্রের কিনারে। জননেত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে ২০০৮ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশ একটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়  একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের দোড়গোড়ায় নিয়ে যায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

About msmh msmh

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: