Home / সহস্রধারা / কবিতা / আতাউল হাকিম আরিফের একগুচ্ছ কবিতা | সহস্রধারা

আতাউল হাকিম আরিফের একগুচ্ছ কবিতা | সহস্রধারা

আতাউল হাকিম আরিফের একগুচ্ছ কবিতা

আমার মা

মা,
আজ বারবার ভেসে আসছে তোমার মুখ
মজাপুকুরের মাটি, নালিতা শাখের বীচি ,
জলপাই আচার
অজস্র পোঁটলায় চিকচিক করছিলো তোমার চোখ!
আগুন-মাটি-জলে তোমার হাতের পাতা
এখনো চলছে অবিরাম!

মা,মাগো
তোমার গর্ভাশয়ে বেড়ে উঠেছিলাম বলেই
অজস্র রঙ গায়ে মাখছি,
নকশী কাঁথা জড়িয়ে আছে বুকে!

মা, ও মা…
তুমি যে আমার গানের পাখি,
তোমার স্নেহদাগে অবিরাম সূর্য আঁকি।

খানকি শব্দটির প্রতিরূপ

আমাদের গ্রামে কতগুলো বাঁশের সাঁকো ছিলো,
এখনো দু-একটি আছে,
ছোটবেলায় সাঁকোগুলো পার হতেই বুকের ধরপড়ানি বেড়ে যেতো!
এখনো জীবনের সাঁকো পার হচ্ছি স্নায়ুচাপে বির্ধস্ত হয়ে!

একদা আমার প্রেমিকা বলেছিলো জীবনটা এক মায়াপুরী,
স্বপ্নজালে ডুব দিয়েই চলতে হয়!

আমি অগ্রাহ্য করতাম, কেননা আমার কাছে জীবনের অর্থই হল ক্রুর তরবারি!
চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে উঠা হিংস্রতা রুখে দিতে হয়, নতুবা নিশ্চিত পরাজয়!

আমি দেখেছি –
আমাদের হাটখোলায় এখনো দেবতার পুজো হয়
তদ্রূপ দেবতাকে পণ্য হতে!

অনুচ্চারিত শব্দগুলো বারবার নেতিয়ে যায়!
জন্মান্ধ আক্রোশে বারংবার কেঁপে উঠে টানবাজারের খানকি-
খানকি শব্দটির প্রতিরূপ মিশে গেছে সর্বত্র।

আমার এই জীবন

আশ-নিরাশার দোলনায় কত যে রঙিন স্বপ্নের ফানুস উড়িয়েছি
কখনো কখনো সন্মুখে কালসাপের ফনা,
আমার এই জীবন নিতান্তই সাদামাটা সন্তরণ,
কখনোবা মরণফাঁদে আটকে যাওয়া থেকে পুনরায় বেঁচে উঠা!
জাতপাতহীন, ছন্দগন্ধহীন জীবন!

মাঝেমধ্যে স্বপ্নঘোরে…
ধুলিকনা, খড়কুটো কিংবা জলের শিরা-
উপশিরায় হাঁটতে থাকি।

রূপান্তরিত সময়ে,
আড়মোড়া ভেঙে দেহের সাধনায় মত্ত হতে গিয়ে
ছিঁড়ে কুটে ফেলি সমস্ত আকাঙ্খা…
শরীর এবং কবিতা একবর্ণে শুষে নেয় প্রকৃতি
তবুও ঝর্ণাতলার নির্জনে সুখ খুঁজি।

কুমারী প্রতিবিম্ব

স্বপ্নে এসে ধরা দেয় কুমারী প্রতিবিম্ব
মিহি বাতাসে কেঁপে উঠে শরীর!

অনভিপ্রেত ঠোঁট, হাত এবং শিশ্নের
বাড়াবাড়ি রকম উচ্ছ্বাসে-
কুমারীর স্তন ও জঙ্ঘায় ভেসে যায়!

বুকের মধ্যে অন্তর্গত স্বপ্নের চাদর বিছিয়ে একনিমিষেই শুষে নিই সমস্ত প্রাচীনতা!

যদি একটিবার ফিরে এসো

কারো কারো ভেতরের রঙ নীল হয়ে থাকে,
কিংবা তাঁদের চোখ দেখছে পূর্ণচাঁদ লগ্ন!
তাঁদের ঠোঁট ,স্তন থেকে নাভি ক্রমশ; নিন্মমূলে ভর করছে আকাঙ্খা!
শত সহস্র ভ্রুণ মরে গেলেও জেগে ওঠে উন্মাদনা!

অথচ আমার ভেতরটা আজ ধূসর মরুভূমি
চুরমার হয়ে যাওয়া মাটির পাত্রের মতোই অর্থহীন,
এই যেনো এক বিবর্ণ আকাশ কিংবা খড়তাপহীন সূর্য!
খাদের পর খাদ পেরিয়েও অনর্গল দুঃখ আসে!
বৃষ্টিহীন দিন, চুম্বনহীন অন্ধকার রাত!

সুচেতনা-যদি একটিবার ফিরে এসো-
আমার ভেতরেও জেগে উঠবে একরাশ নীল।

খেলা!

একজন পাপী সদম্ভে ঘোষণা করছে
খেলতে এসেছি,খেলবো!
বিষদাঁত গজিয়েছ, দুখানা ডানাও…

মাটিতে জমছে তেজষ্ক্রিয়তা-
পাপ!
চৌর্যবৃত্তি, মদের ঝাপি-
সুজাতাদের যৌবন যায় বিকিয়ে!

অতপর; ওরাই দখল নিচ্ছে ময়দান…
সরাইপাড়া থেকে আমবাগান রক্তটানা উৎসব!

উল্টোরথ

মধ্যরাতে হঠাৎ গুঞ্জন, শার্টের বোতাম খোলা যুবকের বিষন্ন চোখ
অতপর; যুবকটিকে নিয়ে নানাবিধ জল্পনা,কল্পনা!
এই শহরেও আজ নেমে এসেছে ক্ষ্যাপাটে অন্ধকার!
কোথাও যেনো উল্টোরথে হাঁটছে-একদল ঘাতক!
সেইসাথে হাঁটছে একখানা ট্রাউজার এবং রক্ষাকবচবিহীন কতিপয় শুদ্ধ পুরুষ।

স্পর্শ

তোমার বিশুদ্ধ শরীরে নেমে আসুক তুমুল বৃষ্টি
যদি বুকে বুক স্পর্শ হয়ে যায়-
নারীর ভেতর জেগে উঠবে পুরুষ!
মনের দ্বার খুলে রেখো, দ্যাখো –
পাঁজর ছেঁচে-হৃৎপিণ্ড ভেদ করছে শব্দহীন অন্ধকার!
লুটপাট হয়ে যাচ্ছে-
তোমার শরীরের রস,গন্ধ, বুকের উপকূল!

প্লাবন

প্রতি সন্ধ্যা বেলায়
ঝিঁঝিঁ পোকার কোরাসে বিস্মিত হই
যেমনটি বিস্মিত হই
তোমার চোখেমুখে যখন দেখি প্লাবন!
সঙ্গোপনে নদীরধারে একেলা ,
প্রবল বর্ষায় তুমুল ভিজতে থাকি।
কি আর হবে….
উত্তুঙ্গ চূড়া থেকে ক্রমস নিচে,
আরো গভীরে, যদি ডুবে যাই!

পরিপূর্ণ পুরুষ

কামোদীপ্তা যুবতীর মনস্তত্ত্ব না বুঝলেও
স্বপ্নাচ্ছন্নতায় বিলীন হয়েছি নিতান্তই বালক বয়সে!
কাউকে কাউকে আফ্রোদিতি জ্ঞান করেছি,
ছাইভস্ম প্রেমের কবিতাও লিখেছি দু-একটি
কাউকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হলে স্বপ্নাদ্য সময়ের অপেক্ষায় থেকেছি
স্বপ্নের আড়ালে পরিচিত চোখ, মুখ,ঠোঁট, উগ্র গন্ধ!
পূর্ণচাঁদ লগ্নে ভেসে বেড়াতাম যুবতীর হাত ধরে,
আগুনভরা উত্তাপে ঝরে পড়তো দু-ফোঁটা বৃষ্টি!
পাপবিদ্ধ হতে হতে একদিন পরিপূর্ণ পুরুষ হলাম।

গণতন্ত্র

একদা পল্টনের আওয়াজে উদ্বেলিত হতাম
মৌচাক কিংবা লালবাগের সংঘাতেও খুঁজেছি পরিবর্তন।
রাজধানী থেকে সর্বত্রগামী গণজোয়ার, তুমুল
উত্তাল!
শরীরে মেখে নিতাম চেতনা, ক্রমাগত গণতন্ত্রের অভিযাত্রা!
এবার বুঝি উপদ্রুত উপকূলে জেগে থাকা মানুষের ভাগ্য পরিবর্তিত হবে!
এখনও আমি সেই গণতন্ত্রের কথা বলছি!

নিঃশব্দে কেউকেউ কাঁদে

কারো কারো মাথায় শক্তপোক্ত শিং গজায়
ওদের বন্দুকের নল সক্রিয় হতে থাকে,
ক্রমেই স্তুপাকার হতে থাকে রক্ত খাওয়া পাপ!
রহস্যময় ব্রিফকেস,কালো চশমা, উলঙ্গ নারী এভাবেই….

অন্যত্র কারো কারো পায়ের নিচে মাটি সরে যায়
নিঃশব্দে কেউকেউ কাঁদে, কাঁদছে
নেশাগ্রস্তের মতো দেখায় ওদের হাত,মুখ,চোখ!

ক্ষতবিক্ষত

আমার ঘরে দেয়ালটির গায়ে ক্ষতবিক্ষত চিহ্ন
খিড়কিগুলোও বেশ জংধরা।
মনে হচ্ছিল ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে
সন্মুখে তাকিয়ে আছে কয়েক জোড়া চোখ!
একখানা পুরোনো পোর্টাল আমার দিকে
তাকিয়ে আছে বিষন্ন দৃষ্টিতে
কন্ঠনালী বিদীর্ণ করে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে
পরাজিতদের কাঠগড়ায়!

About msmh msmh

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: