Home / শিক্ষাঙ্গন / সন্দ্বীপে প্রাথমিক শিক্ষার গুরু জামাল স্যারের পূর্ণাঙ্গ জীবনী

সন্দ্বীপে প্রাথমিক শিক্ষার গুরু জামাল স্যারের পূর্ণাঙ্গ জীবনী

২০০৯ সাল। জামাল স্যারের আমন্ত্রনে মগধরা হাজেরা ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলাম। বিদ্যালয়ের পরিপাটি পরিবেশ দেখে অবাক হয়েছিলাম। যতই দেখছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল হাজেরা ইসলামের অফিস অবকাঠামো, পড়ালেখার গুণগত মান, পরিবেশ, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সার্বিক অবকাঠামো, ওয়াশ রুম, সহ-শিক্ষাপাঠক্রমিক কার্যক্রম সবই যেন পুতুলের মত সাজানো। বিদ্যালয়টি ফলাফল বিবেচনায় একাধিকবার সন্দ্বীপে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। এই সবের মূলে ছিলেন জামাল স্যার।

এ বিদ্যালয়টি ১৯৭২ সালে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল হোসাইন উনার পিতা-মাতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়ের দুজন জমিদাতা হলেন-নূরুল ইসলাম ও হাজেরা খাতুন। প্রতিষ্ঠার ২ বছর পর ১৯৭৪ সালে বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হয়।

২০০৯ সালের ১৪ মার্চ ‘সন্দ্বীপের এক ব্যতিক্রমী বিদ্যালয়’ শিরোনামে ফিচার লিখেছিলাম দৈনিক আজাদী-তে। ২০১১ সালের ২৫ এপ্রিল ‘বিরল সম্মানে অবসর নিলেন মাস্টার মোঃ জামাল উদ্দিন’ শিরোনামে আরেকটি ফিচার লিখেছিলাম দৈনিক আজাদী-তে।

জামাল স্যারের ধীমান নেতৃত্বে ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ান হয়ে ২০টি টিমের সাথে প্রতিযোগিতা করে জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ান হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে মগধরা হাজেরা ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্বাধীনতা পরবর্তীতে গত ৪৯ বছরে শুধু ঐবারই সন্দ্বীপের কোন স্কুল জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ান হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। নীতি -নৈতিকতা, সততার প্রশ্নে অনড়,দক্ষতাসম্পন্ন শ্রদ্ধেয় জামাল স্যার যেখানে হাত রেখেছেন সেখানে ছাই সোনায় পরিণত হয়েছে। আমার সাথে স্যারের সম্পর্ক ছিল অকৃত্তিম। দেখা সাক্ষাতে স্যারের আচরণে মনে হত আমি উনার অন্তরজুড়ে বিরাজমান।

জামাল উদ্দিন ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারী মগধরা ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডে জিয়াউল হক সাহেবের বাড়িতে জন্মগ্রহন করেন। উনার পিতা-মাতা মৌলভী মোঃ জিয়াউল হক ও গোলাপ নূর বেগম।

১৯৬৩ সালে মধ্য মগধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৬৪ সালে মুছাপুর বদিউজ্জামান উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে এই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাশ করেন। ১৯৭২ সালে সন্দ্বীপ সরকারি হাজী এ বি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারী পটিয়া উপজেলার দক্ষিন আশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৮ সালে বিভাগীয় নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পটিয়া উপজেলার চাতরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৮১ সালে পিতার মৃত্যুতে পারিবারিক প্রয়োজনে পটিয়া থেকে উত্তর মগধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলী হয়ে আসেন। যোগদান পরবর্তীতে তিনি সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতিতে আত্ননিয়োগ করায় স্কুল প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবার এ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক বৃত্তি পায়।

১৯৯১ সালে সংঘটিত স্মরণকালের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ে স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী মঞ্জুরা বেগমের অকাল মৃত্যুতে তিনি কিছুদিন পূর্ব মগধরা মফিজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

জামাল স্যার ১৯৯১ সালে মগধরা হাজেরা ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং এই স্কুল থেকেই ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবসরে যান।

মগধরা হাজেরা ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ১ জন ছাত্রী প্রাথমিক বৃত্তি পেয়েছিল। তিনি যোগদানের পর প্রতি বছর গড়ে ৭ জন করে যাদের মধ্যে ট্যালেন্টফুলে ৫৬ জন, সাধারণ গ্রেডে ৫১ জন সহ মোট ১০৭ জন ছাত্র-ছাত্রী প্রাথমিক বৃত্তি লাভ করে।

সামাজিক দায়িত্বে
১৯৮৪ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত জনতা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক (নন্দির হাট), ২০০১ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জনতা সেবা সংঘের সভাপতি, ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বায়তুন নূর জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক, ২০০৭ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বায়তুন নূর জামে মসজিদের সভাপতি, ২০০৫ সাল থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মগধরা হাই স্কুল পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য, ২০০৭ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মগধরা হাই স্কুল পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি, ২০১০ সাল থেকে ২০১২ পর্যন্ত সাউথ সন্দ্বীপ কলেজ পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য, সন্দ্বীপ লেখক ফোরাম-এর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জামাল স্যার।

শিক্ষক নেতৃত্বে
২০০৯ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সন্দ্বীপ শাখার নির্বাচিত সভাপতি, ১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সন্দ্বীপ শাখার সহ-সভাপতি, ২০০৯ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি চট্টগ্রাম জেলা শাখার সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জামাল স্যার।

স্বীকৃতি
১৯৯৬, ১৯৯৭ ও ২০১০ সালে সন্দ্বীপ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে সনদপ্রাপ্তি, ২০০৯ ও ২০১০ সালে ইয়ুথ ক্লাব অব চিটাগাং সন্দ্বীপ কর্তৃক সেরা শিক্ষক হিসেবে সনদপ্রাপ্তি, মাসিক সোনালী সন্দ্বীপ এম. হোসাইন বৃত্তি কর্তৃক শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকের পুরস্কার প্রাপ্তি, মগধরা দ্বীপোজ্জল সংস্কৃতি সংসদ কর্তৃক শিক্ষায় সম্মাননা প্রাপ্তি, ২০১০ সালে মহান বিজয় দিবস উদযাপন কমিটি সন্দ্বীপ কর্তৃক উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জনপ্রিয় নাগরিক হিসেবে সনদপ্রাপ্তি প্রভৃতি।

সন্দ্বীপ আনন্দ পাঠশালা
জামাল স্যার ২০১১ সালের ১ জানুয়ারী সন্দ্বীপ আনন্দ পাঠশালার প্রাথমিক শাখায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে মৃত্যু পর্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

ইন্তেকাল
আমাদের শ্রদ্ধাভাজন জামাল স্যার চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে আজ বুধবার ২৬ আগষ্ট ২০২০ ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে উনার বয়স হয়েছিল ৬৫। তিনি স্ত্রী সুফিয়া বেগম, ২ মেয়ে ৩ ছেলে সহ হাজারো গুনগ্রাহী রেখে মারা যান। স্যারের ৫ সন্তান হলেন-মাসুমা আক্তার লিনা (চাকুরিজীবি), শারমিন আক্তার লুনা (শিক্ষক), সারোয়ার জায়েদ সজল (ব্যবসায়ী), ইবনুল সাহিদ সিফাত (পলিটেকনিক্যালে পড়েন), ইরফান মাহমুদ (চট্টগ্রাম কলেজে পড়েন)।

ইনফরমেশন: জামাল স্যার এবং পরিবার।

লেখক : মুকতাদের আজাদ খান, সম্পাদক- সাপ্তাহিক আলোকিত সন্দ্বীপ

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: