Home / শিক্ষা / শিশুদের জন্য চাই নিরাপদ ইন্টারনেট

শিশুদের জন্য চাই নিরাপদ ইন্টারনেট

লেখকঃতারিকুল আলম
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট
নোয়াখালী

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। ২০০০ সাল থেকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০০ গুণ বেড়েছে। তবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই তরুণ এবং শিশু। এজন্য অনলাইন ব্যবহারকারীদের গড় বয়স ক্রমেই কমছে। দেশের শিশুরা ইন্টারনেটে ঠিক কী করছে, কোন বয়সীরা কোন ধরনের কনটেন্ট দেখছে, এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি কেমন- এসব বিষয় তথ্য বিষয়ক প্র্রযুক্তি বিশেষজ্ঞগণ নানাবিধ চিন্তা ভাবনা করছেন ।

বাংলাদেশে উচ্চমাত্রায় অনলাইনে প্রবেশাধিকারে সুযোগ ও ব্যবহারের দিক থেকে ছেলেরা (৬৩ শতাংশ) মেয়েদের (৪৮ শতাংশ) চেয়ে এগিয়ে আছে। ইন্টারনেটে নিয়মিত সবচেয়ে বেশি যে দুটি কাজ করা হয় তা হচ্ছে, (ক) অনলাইন চ্যাটিং (বার্তা আদান-প্রদান) ও (খ) ভিডিও বা ইউটিউভ দেখা। প্রতিদিন গড়ে ৩৩ শতাংশ সময় অনলাইন চ্যাটিং এবং ৩০ শতাংশ সময় ভিডিও দেখা হয়ে থাকে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে। একটি অংশ তাদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে সেই অনলাইন ‘বন্ধুদের’ সঙ্গে সরাসরি দেখা করার চেষ্টা করে।

দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে। অনলাইনে হয়রানি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন ব্যাপক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এটা দ্রুত অনেকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং অনলাইনে অনির্দিষ্টকাল ধরে এগুলো থেকে যেতে পারে। অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় যারা অনলাইনে ভয়ভীতির শিকার হয়, তাদের অ্যালকোহল ও মাদকে আসক্ত হওয়ার এবং স্কুল ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা বেশি। এ ছাড়া তাদের পরীক্ষায় ফল খারাপ করা, আত্মসম্মান কমে যাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। চরম পরিস্থিতিতে, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন এমনকি আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

১১ বছরের কম বয়সী শিশুরাও প্রতিদিন ইন্টারনেটে প্রবেশ ও ব্যবহার করছে। যদিও ছোট শিশুদের তুলনায় বেশি বয়সী শিশুরা অনলাইনে ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে ক্ষতিকর সামগ্রী, যৌন নিগ্রহ ও অপব্যবহার এবং ভয়ভীতির সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে শিশুরা কখনোই মুক্ত নয়। প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু (১০-১৭ বছর বয়সী) ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করতে শুরু করে। এ ছাড়া শিশুদের একটি বড় অংশ (৬৩ শতাংশ) প্রাথমিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্থান হিসেবে তাদের নিজেদের কক্ষটিকেই ব্যবহার করে। এটা ‘বেডরুম কালচার’-এর ব্যাপকতা নির্দেশ করে, যা অপেক্ষাকৃত কম নজরদারির মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।

অনলাইনে শিশুদের ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও, তাদের ডিজিটাল দুনিয়ার বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখতে এবং তাদের নিরাপদ অনলাইন কনটেন্ট ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে খুব সামান্যই কাজ হয়েছে। ইন্টারনেট তৈরি হয়েছিল বড়দের জন্য। তবে শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠী ক্রমবর্ধমান হারে এটি ব্যবহার করছে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্রমবর্ধমান হারে তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে। তাই ডিজিটাল নীতিমালা, চর্চা ও পণ্যে শিশুদের প্রয়োজন, শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিশুদের বক্তব্য আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত হওয়া দরকার।

ইন্টারনেটের যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, তাদের ক্ষতিকর কনটেন্ট ব্যবহারের দিকে ঠেলে দেয় ও অনলাইনে নিগ্রহের শিকার হওয়াসহ ঝুঁকি ও ক্ষতির মুখে পড়ার মাত্রা বৃদ্ধি করে। সর্বত্রই মোবাইল ডিভাইসের উপস্থিতি বড়দের তত্ত্বাবধান ছাড়াই অনেক শিশুর অনলাইনে প্রবেশের সুযোগ বাড়িয়েছে, যা একই সঙ্গে সম্ভাব্য অনেক বিপদও বাড়িয়েছে।

দিনে দিনে শিশুরা অনলাইনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে, তাই তাদেরকে অনলাইনে নিজেদের নিরাপদ রাখা এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনলাইনে শিশুদের নিরাপত্তা বর্তমান সময়ের শিশু, তাদের মা-বাবা ও শিক্ষকদের জন্য বড় চ্যালেÄ। সকলের সম্মিলীত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি বিষয়ে শিশুদের সাথে কথোপকথন চালানো প্রয়োজন, যেমনটা আমরা তাদেরকে শিখাই কিভাবে জনাকীর্ণ জায়গায়, খেলার মাঠে ও স্কুলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।

শিশুদের জন্য অনলাইন নিরাপত্তার পক্ষে প্রচারণা চালানো জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে প্রয়োজন। যার মধ্যে রয়েছে-
(ক) সব শিশুর জন্য উচ্চ-মানসম্পন্ন অনলাইন উপকরণসমূহ সহজলভ্য করা;
(খ) অপব্যবহার, নিগ্রহ, পাচার, সাইবার উৎপীড়ন ও অনুপযুক্ত বিষয়ের মুখোমুখি হওয়াসহ অনলাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে শিশুদের সুরক্ষা প্রদান করা;
(গ) অনলাইনে শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও পরিচয় সুরক্ষিত রাখা;
(ঘ) শিশুদের অনলাইনে সম্পৃক্ত ও নিরাপদ রাখতে তাদের ডিজিটাল শিক্ষা প্রদান করা;
(ঙ) অনলাইনে শিশুদের সুরক্ষিত রাখে এবং তাদের উপকারে আসে- এমন নৈতিক মান ও চর্চা সমূহকে এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতের ক্ষমতাকে কাজে লাগানো;
(চ) ডিজিটাল নীতিমালার কেন্দ্রে শিশুদের রাখা;
(ছ) ডিজিটাল এই যুগে শিশুদের কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো বিস্তারের মাধ্যমে অনলাইন ঝুঁকি থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবমিলিয়ে আড়াই কোটি বাংলাদেশি শিশু এবং তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকের কাছে পৌঁছানো।

শিশুর জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। যেমন-
(ক) শিশুর ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নজর রাখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের আগে থেকেই সতর্ক হতে হবে।
(খ) ইন্টারনেট কোনো গোপন জিনিস নয় যে বদ্ধ ঘরে দেখতে হবে। এমন পরিবেশ তৈরি করে নিতে হবে যেন শিশু নিদ্বি©ধায় তার সবকিছু অভিভাবকের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে, এতে যেন কোনো সংকোচ বোধ না থাকে।
(গ) শিশু ইন্টারনেটে কী করছে বা কী শিখছে, তা গল্পচ্ছলে জেনে নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি জরুরি।
(ঘ) নানা ধরনের সফটওয়্যার (অ্যান্টিভাইরাস) ব্যবহার করা, যাতে ইন্টারনেটে শিশুর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা যায়।
(ঙ) আবার শিশু কী কনটেন্ট দেখবে, তাও নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের কার্টুন, ভিডিও দেখা সহ ইন্টারনেট ভিত্তিক নানা ধরনের আসক্তি দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে এসব শিশুর মানসিক বিকাশ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে ইন্টারনেট কনটেন্ট দেখায় লাগাম টানতে হবে।
(চ) দিনে এক-দুই ঘণ্টার বেশি যেন তারা ইন্টারনেটে ভিডিও না দেখে তা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশজুড়ে আগামী এক বছরের মধ্যে ১০ লাখ স্কুল শিশু নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সংক্রান্ত সনদ যাতে পেতে পারে সেজন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার সংক্রান্ত সনদ শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতাকেই নিরাপদ করার পাশাপাশি দেশে অনন্য বিশ্ব রেকর্ড তৈরি করবে। শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেটের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে ইউনিসেফের সহায়তায় সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এই কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য ইন্টারনেটকে নিরাপদ একটি জায়গায় পরিণত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

তথ্যসূত্র :
(i) www.unicef.org
(ii) www.bbc.com
(iii) www.wikipedia.org

About msmh msmh

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: