Home / Uncategorized / গল্প || সংগ্রামী মা ও মেয়ে || প্রান্ত নাগ শুভ

গল্প || সংগ্রামী মা ও মেয়ে || প্রান্ত নাগ শুভ

সংগ্রামী মা ও মেয়ে

প্রান্ত নাগ শুভ

এক অজপাড়া গ্রামের কৃষক অনিক। সেই পরিবারের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে অনিক একমাত্র ছেলে সন্তান। গ্রামের মানুষদের ধারণা ছিলো মেয়ে মানুষ কোনো কাজের না। ঘরে মেয়ে সন্তান হওয়া মানে ওই সংসারের বিপদ ডেকে আনা।

এই নিয়ে অনিকের পিতা মাহফুজুর ছিলেন ভীষণ হতাশ। সমাজের মানুষদের চিন্তা ভাবনা এখনো সেই পুরোনো দিনের মতো। তারা মানে মেয়েদের পড়ালেখা করতে হয় না। তাদের রান্না বান্না, সংসারের কাজ শিখতে হয়। এতে তারা বিয়ের পর সুখে সংসার করতে পারে।

সেই হিসেবে অনিকের বাকি পাঁচ বোনকে পড়ালেখা থেকে বঞ্চিত করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহ অপরাধ হলেও সেই অজপাড়া গ্রামে এইসবের কোনো মান্যি নেই।

ছেলেকে পড়াশোনা করার জন্য মাহফুজুর সাহেব স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। অনিক পরিবারের সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাওয়া সত্ত্বেও সে লেখা পড়ার ধারে কাছে ছিলো না। তাই,সে তার পরিবারের ঐতিহ্যগত পেশা কৃষিকাজ কে বেছেই নিলেন। কিন্তু,অনিকের উন্মাদী চাল চলন অার্থিক ভাবে পিষিয়ে দিয়েছিলো।
এখন দিন এনে দিনে খাওয়ার মতো চলছে তাদের জীবন।

বিয়ের বয়স হতেই বিয়ে করে অনিক। কারণ,তার মা বাবা চাই একটা পুত্র সন্তানের।বংশধর লাগবে যে। পুত্র সন্তানের জন্য যত আদর সমাদর করা যায় সব করছে বধূ রেশমি কে। সবার একটা ই চাওয়া তাদের যেন পুত্র সন্তান হয় এবং কন্যা সন্তান নামক অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়।

কিছুদিন পর তাদের সমস্ত ভাবনাকে মিথ্যা করে কন্যা সন্তান লাভ করে অনিক এবং রেশমি। পরিবারের সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। কেউ খুশি না হলেও রেশমি খুব খুশি হয়। এবং সে তার পুত্রী র নাম দেয় তারামন,সংক্ষেপে তারা।

রেশমি স্বপ্ন দেখা শুরু করে তার মেয়ে তারা তারার মতো জ্বলবে। সকলের মেয়েদের জন্য ঘৃণা মুছে গিয়ে মেয়েদের ভালোবাসার জায়গা তৈরি করে নেবে তারা। মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ায় কত কি যে শুনতে হয়েছে রেশমি কে। একসময় নির্যাতন ও শুরু করে রেশমির উপর আরেকটা পুত্র সন্তানের জন্য।

শ্বশুর-শাশুড়ি,আত্নীয়-স্বজন সকলের নানা অপমানের পর ও রেশমি তারাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়।ধীরে ধীরে তারামন বড় হতে থাকে। ভালো রেজাল্টের কারণে তারা কে কেউ দমাই রাখতে পারি নি কোনো ক্লাশে। কিন্তু, পরিবারের অত্যাচার,নির্যাতন সহ্য করতে করতে ক্লান্ত রেশমি।

অনেক কষ্টে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াতে সক্ষম হয়েছিলো রেশমি।খুব ভালো রেজাল্ট করে তারামন।কিন্তু,তার পরিবার কোনোভাবেই আর পড়াতে রাজি না।মেয়ে বড় হয়েছে,এখন বিয়ে দিয়ে দিতে হবে।রেশমি কোনোভাবেই চাইছিলেন না,তারামন পড়ালেখা বন্ধ করুক।

আগ পিছ না ভেবে রেশমি তার গহনাগাঁটি,আর কিছু টাকা পয়সা দিয়ে তারাকে পাঠিয়ে শহরে। কারণ,গ্রামে থাকলে সে আর পড়তে পারবে না। তাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। এরপর,রেশমির উপর নির্যাতন শুরু হয়ে যায় আরো প্রখর ভাবে।

তারা শহরে গিয়ে কলেজে ভর্তি হয়।ধীরে ধীরে সে শহরের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়া শুরু করে। আর মাঝরাত হলে কেঁদে বুক ভাসায় মায়ের জন্য। সেই কান্না যেন খুব অদ্ভুতভাবে আঘাত করে রেশমির অন্তরে। সহপাঠী দের মোবাইল নিয়ে মাসে ২/১ বার কথা বলার সুযোগ হয় মায়ের সাথে। তারা অনেক বুদ্ধিমতী ও ছিলো বটে। ছোট একটা চাকরি জোগাড় করে তারামন। সেই টাকা দিয়েই তার পড়াশোনা এবং চলাফেরা।

পার হয়ে গেলো আরো ছয়টি বছর। আজ তারামন একজন সনামধন্য ডাক্তার। মাস দুই আগে ডাক্তারি পাশ করে তারামন। কিন্তু, বিগত ছয়মাস ঘরে কোনো যোগাযোগ ছিলো না পরিবারের কারো সাথে। আজ সে বাড়ি ফিরতেছে হাতে মিষ্টিরহাড়ি।

সে বাড়ি ফেরার পর এমন কিছু হবে ভাবতেই পারে নি। গ্রামের সবাই জড়ো হয়ে আছে বাড়ির সামনে তারা কে বরণ করবে বলে। অত্র গ্রামের একমাত্র উচ্চশিক্ষিত তারা, তাও আবার একটি মেয়ে হয়ে। তারাকে ফুলের মালা পড়িয়ে বরণ করার অপেক্ষায় ছিলো গ্রামের লোকজন।যে বাবা চাইছিলো না মেয়ে পড়াশোনা করুক,সেই বাবার চোখে আজ অশ্রু। খুশি অশ্রু,সুখের অশ্রু, গর্বের অশ্রু।

গ্রামের মোড়ল মালা দেওয়ার আগে তারামন থাকে থামিয়ে দেয় এবং বলে,
আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গিয়েছিলো:-
““বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

মেয়েদের ফেলনা ভাববেন না। আমার মায়ের আত্নবলিদান আজ একজন আমাকে একজন মেয়ের হয়ে কথা বলতে শিখিয়েছে। যদি এখন থেকে সমস্ত কুঃসংস্কার দূর করে ছেলে-মেয়ে সমান অধিকার প্রতিষ্টা করার শপথ নেন তবেই আমি এই মালা গ্রহণ করবো।
তখন থেকে সেই অজপাড়া গ্রাম হয়ে উঠে স্বয়ংসম্পূর্ণ।আজ মেয়েরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে,গান গায়,নাচ করে। কেউ আজ অবহেলিত নয়। ছেলেদের সাথে সমানে সমান।

বড়-দারোগাহাট, সীতাকুন্ড, চট্টগ্রাম

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: