Home / সহস্রধারা / গল্প || ঈদে অনিচ্ছুক ইচ্ছে || মোঃ রাকিব হোসেন

গল্প || ঈদে অনিচ্ছুক ইচ্ছে || মোঃ রাকিব হোসেন

ঈদে অনিচ্ছুক ইচ্ছে

মোঃ রাকিব হোসেন

_বা’জান হুনছ??

_হ্যাঁ! মা বল হুনতাছি তো..

_বা’জান ঈদ তো চইল্লা আইতাছে আমাগরে নতুন কুর্তা কিন্না দিবা না??

_ এহন তো মার্কেট বন্ধ। জামা কোত্তেইকা আনুম মা??

_ক্যাঁন বা’জান আমার বান্ধবীরা যে হাটের তে কিন্না আনছে?? কতো সুন্দর সুন্দর কুর্তা আনছে বা’জান!!

_এখন তো জিনিসের ম্যাঁলা দাম, আর বা’জানের কাছে তো অহন ট্যাহা নাই। ব্যারামটা আহনের পর থেইক্কা তো রিসকা বন্ধ। মহাজন ও রিসকা দিবার চাই না। এতো ম্যাঁলা দাম দিয়া তোগো কুর্তা কেমনে কিন্না দিমু।

_আমি জানিনা বা’জান ঈদে আমাগরে নতুন কুর্তা কিন্না দিবা। আর বা’জান হুনো.. ঈদে তো সবাই সেমাই খায় আমগো লাইগা ও সেমাই আইনো। আর বা’জান কতো দিন হলুদ হলুদ ভাত গুলা খাই না,, খুব খাইতে মন কইতাছে বা’জান। ঈদের দিন খাওয়ায়বা??

_আইচ্ছা মা দেহি। দোকানী তো আর বাইক্কা দেয় না। কইয়া দিছে গত দুমাসের ট্যাহা না দিলে আর সদাই দিবো না। আইচ্ছা তুই অহন ঘুমা।

আলো মা….আলো মা একটু হুইন্না যা তো..

_বা’জান কিছু কইবা??

_হ্যাঁ! একটু বয় এইহান দিয়া। রাত্রি মা তো বায়না করতাছে ঈদে কুর্তা কিন্না দিতে প্রভাতীর ওতো ভালো কুর্তা নাই। আবার কয়তাছে বিরানি খায়বার মন চাইতাছে। আমি কাল মহাজনরে বুঝাইয়া কইয়া রিসকা লইয়া বইর হমু। তোর কুর্তা লাগবো??

_বা’জান আমার লাগবো না।গতো ঈদের গোলাপি আর সাদা রঙ্গের যেই কুর্তাটা কিন্না দিছিলা, ঐডা ধুইলে এহনো এক্কেরে নতুনের লাহান লাগে। দু তিন দিকা সেলাই খুইল্লা গেছে সেলাই কইরা দিমু নে। আর তুমি তো কইছো ঐ জামাডা গায়ে দিলে আমরে পরীর লাহান লাগে। আমি ঐডাই পরুম। যদি রাত্রি প্রবাতির কুর্তা কিন্না ট্যাহা থাকে আমার কুর্তা কিননের ট্যাহা দিয়া তোমার লাইগা এক্কান লুঙ্গি কিন্না লইয়ো তোমার তো ভালা লুঙ্গি নাই। আর আমারে চাল আর মুরগী আইন্না দিলে ওগোরে বিরানি রাইন্ধা খাওয়ামু।

_মারে তুই এতো ভালা ক্যাঁন?? তুই এক্কেরে তোর মায়ের লাহান হইছস।

_আচ্ছা অহন ঘামাইয়া যাও। বিয়ানে তো রিসকা লইয়া বাইর হইবা কইছো।

আইচ্ছা তুই ও ঘুমা, আমার প্রভাতী মারে একটু বাতাস কইরা দিস্ ম্যালা গরম।

এ বলে হারিকেনের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে শুক্কুর আলী। সকালে ঘুম থেকে উঠে অনেক কাকতি মিনতি করে মহাজনের হাত পা ধরে ৫০টাকা বেশি দিবে বলে তার রিক্সা নিয়ে বের হয়। অনেকক্ষণ হয়ে গেল কোন যাত্রী নেই। থাকবে কেমনে লক ডাউনে কেউ তেমন বের হচ্ছে না। দিনে কয়েকটা ভাড়া হয়েছে মাত্র,সন্ধায় বাড়ি ফেরার আগ মুহুর্তে দুজন যাত্রী সহ পুলিশের সামনে পড়ে যায় শুক্কুরআলী।

_কীরে শালা জীবনের মায়া নাই?? করোনার জন্য তোদের ঘরে থাকতে বলা হয়ছে তুরা রিক্সা নিয়া বের হলি ক্যাঁন??

এই বলে শুক্কুরআলীর পিঠে সজোরে কয়েকটা লাঠির ঘাঁ বসিয়ে দেয় পুলিশ। ঘামে ভেজা পিঠে তার গায়ে যেন কেউ গরম তেল ডেলে দিয়েছে ওভাবে জলে উঠেছে। কান্না জড়ানো কন্ঠে বললো..

_স্যার আমগোরে করোনা মারবো না। আমগোরে খিদায় মাইরা ফেলাইবো স্যার। মা মরা মাইয়াডা ঈদে নতুন কুর্তা চাইছে তাই আজ দুমাস পর রিসকা লইয়া বাইর হয়ছি আর মাইরেন না স্যার চইল্লা যাইতাছি।

এ বলে যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যে চললো শুক্কুর আলী। যাত্রীরা নেমে ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বলে “মামা আমাদের জন্য তুমি মার খেলা এগুলো রাখো তুমি ঔষধ কিনে নিও”

শুক্কুরআলী নিতে না চাইলে ও জোর করে দিয়ে দেয়।

এর পর আরো দুদিন রিক্সা চালিয়ে মহাজনের টাকা বুঝিয়ে দিয়ে আটশো টাকা ছিল। ভ্যান গাড়ি থেকে রাত্রি ও প্রভাতির জন্য দুটা জামা কিনে নেয়, একটা মুরগি, চাল, আলু ও সেমাই নিয়ে বস্তিতে ফিরে যায় সে। নতুন জামা পেয়ে রাত্রি ও প্রভাতি অনেক খুশি আর দুই দিন পর ঈদ। ঈদে নতুন জামা পরবে সেমাই খাবে বিরানি খাবে।

জামা খুলে পাটিতে বসে মেয়েদের হাসি দেখছে আর ভাবছে আজ যদি ওদের মা থাকতো কতো খুশি হতো।

_বা’জান তোমার পিঠে এতো দাগ ক্যাঁন??(আলো)

_কিচ্ছু নারে মা!! ঐ লক ডাউনে রিসকা লইয়া বাইর হয়ছি তো পরশুদিন পুলিশে মারছে।

শুনেই আলোর দুচোখ বেয়ে পানি পড়তে লাগল। রান্না ঘর থেকে সরিষার তেল এনে পিঠে লাগিয়ে দেয়।

_বা’জান পরশু মারছে তুমি আমারে কও নাই ক্যান তেল লাগাই দিলে তো দরদ কইম্মা যাইতো। ওরা এমন নির্দয় ক্যান??এমন কইরা মাইনষেরে মাইনষে মারে??

ঈদের চাঁদ উঠেছে সবাই খুশি। রাত্রি প্রভাতি কতো আনন্দ করছে। শুক্কুর আলীর ভীষণ জ্বর ও কাশি, কাশতে কাশতে গলা ব্যাথা করছে। ঢোক গিলতে ও পারছে না। নিশ্বাস নিতে ও খুব কষ্ট হচ্ছে। আলো দোকান থেকে ঔষধ এনে দিয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই কমছে না।

ঈদের সকাল। আলো খুব ভোরে উঠে বিরানি ও সেমাই রান্না করছে। রাত্রি প্রভাতি ও নতুন জামা পড়ে পাশে বসে আছে। কখন রান্না হবে কখন খাবে। কতো খুশি তারা।

_রাত্রি যা বা’জানরে ডাইকা তুইল্লা দে.. নামাজে যাইবো তো।

_বা’জান ও বা’জান উঠো আলো আফা কইছে নামাজে যাওনের সময় হয়ছে। ওডো.. বা’জান ও বা’জান.. বা’জান কথা কও না ক্যাঁন?? ওডো না..!!
আফা..!! আফা..!! বা’জান তো ওডে না কথা ও কয় না।

_কই দেহি তো..
বা’জান,, ও বা’জান ওডো দেহ তোমার রাত্রি প্রভাতি নতুন কুর্তা গায়ে দিছে আমি বিরানি আর সেমাই রানছি ওডো এক লগে খামু..

বাবার অবস্থা দেখে কী হয়েছে আলোর বুঝতে বাকি নেই। বাবার দেহকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে সে..

_আফা বা’জান কথা কয় না ক্যাঁন?? আমি নতুন জামা পড়ছি আমার দিকে তাকায় না ক্যান??প্রভাতি তুই ডাক না বা’জানরে..বা’জান তোর ডাকে ওডবো। ডাক না বা’জানরে.. (রাত্রি)

_বা’দান ও বা’দান ওতো.. আমি থুন্দর তু্ত্তা দায়ে দিতি.. দেতো.. ওতো.. আমারা হলুদ ভাত থামু ওতো.. তুমি না থাওয়ায় দিলে আমি থামু না……(প্রভাতি)

রমজান আলী পাড়া, পশ্চিম লালা নগর, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: