Home / সহস্রধারা / সায়েন্স ফিকশন গল্প || স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহ || স্নিগ্ধা দেবনাথ

সায়েন্স ফিকশন গল্প || স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহ || স্নিগ্ধা দেবনাথ

স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহ

স্নিগ্ধা দেবনাথ

প্রায় ১৪বছর পর আমি আর নিশাত পৃথিবীতে ফিরে আসছি সেটা ভাবতেই নিজের মধ্যে কেমন করছে অনুভব করতে পারছি না। নিজের মধ্যে একটা কঠিন উত্তেজনার সৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু পর মূহুর্তে একটা কথা মনে পড়ে গেল সেটা হলো আমরা পৃথিবীতে জুতার স্যাম্পল আনতে এত বছর পর ফিরে যাচ্ছি। স্যাম্পল নিয়ে আবার স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহে পুনরায় ফিরে যেতে হবে।

স্পেকটোকোরাল গ্যলাকটিক গ্রহের দূরত্ব পৃথিবী থেকে ৩০৯ আলোকবর্ষ দূরে।সেখানে ক্যাঁকো ক্যাঁকো নামে কিছু প্রানী বাস করে।তারা নিজেদেরকে অতি বুদ্ধিমান বলে দাবি করে।মেধা ও মননে তারা নাকি পৃথিবীর মানুষের তুলনায় বাম্বু রেক্টার
স্কেলে কয়েকগুন এগিয়ে!
তাই একাডেমী থেকে আমাদেরকে স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহে পাঠানো হয়েছে গ্রহটাকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য এবং মানুষ থেকে কি ওরা সত্যিই কয়েকগুন এগিয়ে তা দেখার জন্য।

প্রায় ১৪ বছর আমি আর নিশাত গ্রহটাকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলাম। প্রানিগুলো সত্যিই অনেক বুদ্ধিমান। তারা দলবদ্ধভাবে একে অপরকে সাহায্য করে বসবাস করে। এমনকি পৃথিবীর মানুষ থেকে তারা কোনো অংশে কম নয়।

এক বছর আগে আমরা একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। এত কিছুর পরেও তারা একটা জিনিস আবিষ্কার করতে পারে নি। সেই জিনিসটি হলো জুতা।জুতার অভাবে পথ চলতে গিয়ে ক্যাঁকো ক্যাঁকোদের ভীষণ সমস্যায় পড়তে হয়। তাই স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহের রাজাধিরাজ জুক নির্দেশ দিলেন,”ক্যাঁকো ক্যাঁকো সভ্যতা রক্ষা করতে যেখান থেকে যেভাবে পারো পা রক্ষার কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়ে আসো।”

কয়েকদিন পর আমি আর নিশাত জুকের সাথে পরামর্শ করতে তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম,
-“মিঃ জুক, আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি।”
-“কীভাবে?””আমাদের পৃথিবীর মানুষেরা পা রক্ষাকারী বস্তু জুতা ব্যবহার করি। তুমি চাইলে পৃথিবী থেকে জুতার স্যাম্পল এনে দিয়ে তোমাদের সাহায্য করতে পারি।”

“অবশ্যই,চাই। তোমাদের পৃথিবীর মানুষদের সত্যিই বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। তোমাদের অসাধ্য কোনো কাজ নেই। আসলেই তোমরা সৃষ্টির সেরা জীব।
আজই তোমরা পৃথিবীতে যাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে নাও।”

স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহে আসার সময় আমরা জুতা নিয়ে প্রবেশ করতে পারিনি।কারন, ক্যাঁকো ক্যাঁকোদের নিয়মের বাইরে কিছু করলে ওরা এর বিনিময়ে প্রান নিয়ে নেয়। তাই আবার পৃথিবীতে যেতে হচ্ছে জুতার স্যাম্পল আনার জন্য।

একাডেমী থেকে আসার সময় আমাদের সাহায্য করার জন্য কয়েকটি দ্বিতীয় মাত্রার এবং একটি চতুর্থ মাত্রার রোবট দেয়া হয়েছিল। এই রোবটগুলো গত ১৪বছর ধরে আমাদের সঙ্গী হয়ে আছে।

আমাকে আর নিশাতকে বহু পথ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছাতে হবে। তাই যাত্রা শুরুর দুইদিন পর আমাদের একটি শীতল ঘরে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হলো। এই দুইদিন আমরা রোবটগুলোর সাথে অনেক দুষ্টুমি করেছি। এদের মধ্যে সকল মানবিক গুন আছে। আমাদের ঘুমের পরে এরাই মহাকাশযানটি নিয়ে যাবে পৃথিবীর দিকে। এটি একটি পঞ্চম মাত্রার মহাকাশযান।

পৃথিবীতে পৌঁছনোর ৪৮ ঘন্টা আগে আমাদের ঘুম ভাঙল। শীতল ক্যাপসুলের মধ্যে বসে অনুভব করতে পারছি না আমরা এখন কোথায় আছি! পুরো শরীর শীতল হয়ে আছে।

সবকিছু নিয়ে চিন্তা করছি,এমন সময় একটা রোবটের ডাকে স্তম্ভিত ফিরে পেলাম।
সে এসে বলল,
“আপনাদের স্বাগতম। আর মাত্র ৪৮ঘন্টার মধ্যে আমরা পৃথিবীর বুকে অবতরণ করতে যাচ্ছি।”

পরবর্তী ২৪ঘন্টা নানা কাজে চলে গেল। আমরা ইতিমধ্যে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করতে যাচ্ছি।
অবশেষে মহাকাশযানটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে রেখে একটা স্কাউটশিপে করে পৃথিবীর নগরীতে প্রবেশ করলাম।

কাউন্সিলের প্রধান চতুর্থ মাত্রার রোবট ক্যাপ্টেন জ্যাক।
সে এসে আমাদের স্বাগতম জানালো। রোবট হলেও এটি মানুষের থেকে দুই মাত্রা উপরে। আমি আর নিশাত মুখে মাস্ক,হাতে গ্লাভস পরে বের হলাম।

পৃথিবীতে পনেরো দিন কাটানোর পর আজ আবার আমাদের জুতার স্যাম্পল নিয়ে স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহে ফিরে যেতে হচ্ছে। যাত্রা শুরু হওয়ার ২৪ঘন্টা পর জ্যাক এসে আমাদের জানালো,
“কিছুক্ষন আগে পৃথিবী নামক গ্রহটি সৌরজগৎ থেকে ধ্বংস হয়ে গেছে।”

কথাটা শোনামাত্র আমি আর নিশাত চিৎকার করে উঠলাম।কথাটা যেন বিশ্বাস হচ্ছে না!একটু আগে যে পৃথিবীটাকে সুস্থ দেখে আসলাম সেই পৃথিবীটা এখন নিশ্চিহ্ন হয়েগেছে।
কি করব বুঝতে পারছি না!

জ্যাক এসে আমাদের শান্তনা দিতে লাগল,
-” দুঃখ করছেন কেন? আপনাদের ভাগ্যটা অনেক ভালো যে আপনাদের বসবাসের স্থান পৃথিবী গ্রহটি ধ্বংস হওয়ার পরেও আপনারা বেঁচে আছেন। হয়ত মানুষ জাতির মধ্যে আপনারাই দুজন ব্যক্তি যারা এখনো বেঁচে আছে।”

“বেঁচে থেকে কি হবে? আমাদের আপনজন,
আমাদের জন্মস্থান পৃথিবী নামক গ্রহটিকে আমরা আর ফিরে পাবো না।”
-“পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার জন্য আপনারা নিজেরাই দায়ী।”
-“কীভাবে?”

“একমাত্র আপনারাই এমন জাতি আছেন,যারা নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনেন। পৃথিবীকে বাঁচাতে যে সম্পদগুলো সংরক্ষন করার প্রয়োজন ছিল আপনারা সেগুলো ধ্বংস করে ফেলছেন। দিনের পর দিন পাহাড় কেটে পাহাড়ের অস্তিত্ব মুছে দিয়েছেন,নদনদী ভরাট করেছেন,বায়ুমন্ডলকে দূষিত করেছেন,খনিজ সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন,গাছপালা কেটে ফেলেছেন,বিশুদ্ধ পানিকে দূষিত করেছেন।এগুলো ছিল পৃথিবীর বাঁচার শক্তি।কিন্তু আপনারা সেগুলো সংরক্ষন করার বদলে ধ্বংস করেছেন। তাছাড়া আপনারা মানুষেরা নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নিজের অনুরূপ আরেকটি মানুষকে মেরে ফেলেন,ভাই হয়ে ভাইয়ের ক্ষতি চান,চাচা হয়ে মেয়ের সমান ভাতিজিকে ধর্ষন করেন, সন্তান হয়ে বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতাকে ভালো রাখার বদলে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেন,আরো কত কি করেছেন। সৃষ্টিকর্তা আপনারা মানুষ জাতিকে সেরা জীব বানিয়ে দিয়েছিলেন। আপনাদের মতো অন্য কোনো প্রানীর তত বিচার বুদ্ধির ক্ষমতা নেই। কিন্তু আপনারা এই ক্ষমতাটা কাজে লাগাতে পারেন নি। যে গুটিকয়েক মানুষ ভালো ছিল তারাও ভয়ংকর এদের জন্য আজ ধ্বংস হয়ে গেল।”

আমি আর নিশাত জ্যাকের কথাগুলো মন দিয়ে শুনলাম। আমাদের ধ্বংসের জন্য একমাত্র আমরা নিজেরাই দায়ী। আমরা যদি অনেক আগে থেকে সচেতন হতে পারতাম তাহলে হয়তো পৃথিবীটা ধ্বংস হতো না।

পরিশেষে আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেল আমরা স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহে বাস করছি। ক্যাঁকো ক্যাঁকো প্রানীদের জুতার স্যাম্পলের মতো আরো অনেক কিছু দিয়ে সাহায্য করে আসছি। এরা কখনো নিজের ক্ষতি নিজে করে না।বিচার বুদ্ধির ক্ষমতা মানুষের মতো না হওয়া সত্ত্বেও তাদের বসবাসের গ্রহটাকে কখনো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় না। স্পেকটোকোরাল গ্যালাকটিক গ্রহটাকে সংরক্ষন করে রাখাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

রাজনগর, মৌলভীবাজার, সিলেট

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: