Home / সহস্রধারা / গল্প: একজন রহিমা ও করোনার সর্বগ্রাসী বিস্তার – আতাউল হাকিম আরিফ

গল্প: একজন রহিমা ও করোনার সর্বগ্রাসী বিস্তার – আতাউল হাকিম আরিফ

একজন রহিমা ও করোনার সর্বগ্রাসী বিস্তার

আতাউল হাকিম আরিফ

করোনা মহামারী রূপ ধারণ করায় কয়েকদিন ছুটি পেয়েই রহিমা চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে ছুটে গিয়েছিলো নিজবাড়ী কুমিল্লার মুরাদনগর।অনেকদিন বাপের বাড়িতে যাওয়া হয়নি তার। দুই ঈদে ছুটি পেলেও যেতে হতো স্বামীর বাড়ি বরিশালের চরফ্যাশন। কিন্তু কিছুদিন হলো স্বামী অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করে রহিমাকে ছেড়ে চলে গেছে! যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন। রহিমা আগে থাকতো চট্টগ্রামের ফরিদার পাড়া নামক একটি এলাকায়,স্বামী জুনু সিএনজি চালাতো। রহিমা তখন মুরাদপুরের একটি গার্মেন্টস এ চাকরিতে করতো ,তিন চারমাস হলো সিইপিজেড এলাকায় চাকুরী নেওয়ার সুবাদে কলসী দীঘির পাড়ে বাসা নিয়েছে।সাথে রহিমার দুই বছরের একটি মেয়ে টুসটুসি।নাতনীর জন্মের পরপর-ই বাবা মা ফরিদার পাড়ার বাসায় এসে কয়েকদিন থেকে চলে যায়, সেই থেকে আর মেয়ে ও নাতনীর মুখ দেখা হয়ে উঠেনি তাঁদের। অফিস প্রায় এক সপ্তাহের ছুটি, রহিমা যে গার্মেন্টস চাকরি করতো ম্যানেজার সুদীপ্ত চক্রবর্তী বারবার বলে দিয়েছে বাসা ছেড়ে কোথাও না যেতে,বাসা থাকতে এবং আশেপাশে কোথাও বের হলেও হাত ধুয়ে ধোয়া সহ অন্যান্য সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়ে দেয় শ্রমিকদের।রহিমা কিছুটা সচেতন হলেও বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য অনেকদিন যাবত সে হাপিত্যেশ করছিলো। তাই সুযোগ পরদিন সকালেই রওনা হয়!যেই বেরিয়ে পড়লো বড় রাস্তার এসে দেখলো পরিবহন বিড়ম্বনা! অনেক কাঠখড় পুড়ে প্রায় ৬ টি গাড়ী পাল্টে বাড়ীতে পোঁছালো।বাড়িতে পোঁছে মাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদলো কিছুক্ষণ। ও মা তুমাগোরে দ্যাখতে আইয়া পড়লাম! তুমাগো না দ্যাইখা কি থাওন যায়! বাবা কডে, এহনো ফেরেনি!এমনি উচ্ছ্বাস রহিমার, রহিমাও মাও নাতনীরে কোলে লইয়া মাইয়্যার দিকে মনোযোগ না দিয়া বলতে থাকে উরে আমার টুসটুসি, টুসটুসি সোনা পাখি-নানীরে দ্যাখতে এতদিন পর আইলি!রহিমার বাবা রিকশাচালায়,ভাই টুকটাক কিছু কাজ করে সামান্য আয় রোজগার করতো, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস গাড়ি এক্সিডেন্ট করে অনেকদিন যাবত বিছানায় পড়ে আছে!পরিবারে অভাব দেখে অনেক কষ্টে জমানো জমানো ৩০০০ টাকাও তুলে দিলো বাবার হাতে!এরমধ্যে লকডাউন!কড়াকড়ি শুরু হলো সর্বত্র,রাস্তায় আর্মি নামানো হলো।বাবার আয়রোজগারও প্রায় বন্ধ হওয়ার যোগাড়, তবুও মেয়েকে মেয়ের দেয়া ৩০০০টাকা পুঁজি নিয়ে ৭টা দিন তাঁদের মোটামুটি ভালোই যাচ্ছিল!৫ তারিখ রহিমার গার্মেন্টস খোলা, কেউকেউ বলছে দেশের পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে গার্মেন্টস হয়তো আরো কিছুদিন বন্ধ থাকবে-অফিস আদালত বন্ধের ঘোষণা আসলেও গার্মেন্টস বন্ধ থাকার কোনো ঘোষণা না আসায় রহিমা হতাশ হয়ে পড়ে, বাবার বাড়িতে ভালো লাগছে তার, মেয়েটাও নানা নানীকে পেয়ে বেশ ভালো আছে, ভেতরে ভেতরে করোনা ভয়েও আতঙ্কিত! তাই একেবারেই চট্টগ্রাম আসতে মন চাইছে না তাঁর, কিন্তু ভাই যে তাঁর পক্ষাঘাত গ্রস্ত হয়ে বিছানায়,বারার আয় রোজগার নেই বললেই চলে! মনের ভেতর পাথর বেঁধে একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে ৪ এপ্রিল-২০২০ একেবারেই সকাল সকাল চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলো রহিমা!আবারও একই রকম ভোগান্তি বলতে গেলে আগের থেকেও অনেক বেশি!তবুও ভ্যান,
সিএনজি করে করে বেশ কয়েকটা গাড়ি পাল্টিয়ে চট্টগ্রাম মুখী যাত্রা! প্রতিমধ্যে আর্মির জেরা,শেষ পর্যন্ত আইডিকার্ড দেখে ছেড়ে দিলো! রহিমা যতগুলো গাড়িতে উঠছে সবগুলোতেই তার-ই মতো কিছু যাত্রীদের উঠানামা!দুইজন সঙ্গীও জুটে গেলো সিইপিজেড এর।শরীর জুড়ে প্রচণ্ড ক্লান্তি, মনের ভেতর রাশিরাশি হতাশা,রহিমার একবার ইচ্ছে হলো গাড়ির তলে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন শেষ করে দেয়!ছোট্ট বাচ্ছাটির মুখের দিকে চেয়ে- পুনরায় যাত্রা! আনুমানিক সন্ধ্যা ৭.৩০ অলংকার মোড়, চট্টগ্রামে এসে নামলো,সেখান থেকে বড়পোল, বড়পোল থেকে টমটম যোগে আনন্দবাজার হয়ে কলসী দীঘির পাড়!প্রতিমধ্যে গাড়ীতে অনেকেই করোনা নিয়ে আলোচনা করছিলো-একজনের কথায় রহিমার কানে বাজছে বারবার!” জানিনা বাচি থাকুম কিনা!জেবাবে করনা আচবো হুনতাচি-মনে অর বেসিদিন বাচতাম না,কাজেরলাই য়ারা বারওই যাইর!” কথা বলছিল আর খুল্লুর খুল্লুর কাশতেছিলো! রহিমা মনে মনে বলে “এখনই যদি মরি যাইতাম বাচি যাইতাম! আমাগো বাইচা থাইকা কি লাব!”রহিমা অবশেষে কলসী
দীঘির পাড় হানিফ কলোনীতে নিজের বাসায় আসলো, এর কিছুক্ষণ পরেই কেরানী ছমুদ মিয়া ভাড়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেলো! ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে রহিমা পাশের ঘর থেকে একমুঠো ভাত খুঁজে নিয়ে মেয়েটারে খাওয়াইয়া নিজে দুই গ্লাস পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো!পরদিন যথারীতি অফিস করলো-অফিস থেকে ফিরে আসতে না আসতেই প্রচণ্ড,জ্বর আসলো সেইসাথে হাঁচি-কাশি! রহিমা আবারও অবাঞ্চিত হয়ে পড়লো-ক্রমশ; হাঁচি-কাশি,জ্বর এবং করোনার সর্বগ্রাসী বিস্তার!

About admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: